সাংস্কৃতিক দাসত্ব রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়

0
908

যদিও এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আমাদের ঈমান এবং মানুষ হিসেবে আমাদের জন্য পরিচিতি দিক থেকে বিদেশি রাজনৈতিক শাসন এর চাইতে সাংস্কৃতিক অধীন অনেক বেশি ক্ষতিকর তবে বাস্তবে সাংস্কৃতিক দাসত্ব ও রাজনৈতিক দাসত্বর সঙ্গে শুধুমাত্র সম্পৃক্ত নয় বরং সকল কাজে অবিভাজ্য। প্রায় ৬০০ বছর আগের কৃতি মুসলমান ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তার মুকাদি্দমাই এ সত্য স্বীকার করেছেন। বিজিতরা সবসময় বিজয়ীদের পোশাক, প্রতীক, বিশ্বাস এবং অন্যান্য আচার-প্রথা অনুকরণ করতে চেষ্টা করে। এর কারণ হচ্ছে মানুষ সবসময় বিজয়ীদের কাছে প্রিয় পাত্র হতে আগ্রহী। এটা দুই কারণে হয়।

প্রথমতঃ বিজয়ীদের প্রতি শ্রদ্ধা, দ্বিতীয়তঃ বিজয়ীদের মত যোগ্যতার অধিকারী হলে তাদের পরাজয় হতো না এই মনোভাব হেতু যোগ্যতা অর্জনের জন্য। এই বিশ্বাস দীর্ঘস্থায়ী হলে এটা একটা ব্যাপক আস্থার ভাব সৃষ্টি করে। বিজয়ীদের সকল কিছু অনুকরণে বিজিতরা অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। এই বিশ্বাস অজ্ঞাতভাবে অথবা বিজয়ের জন্য বিজয়ীদের শারীরিক শক্তির চাইতে আচার-আচরণ প্রাধান্য বিস্তার করেছে এই বিশ্বাস থেকে সৃষ্টি হতে পারে। এই অবস্থায় তখন এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে বিজয়ীদের অনুকরণ পরাজয়ের কারণ দূরীভূত করবে। এইভাবে দেখা যায় বিজিতরা পোশাক, অস্ত্রধারণ, যন্ত্রপাতি এবং জীবনযাপনের সকল পদ্ধতিতে বিজয়ীদের অনুকরণ করে। বস্তুত প্রতিটি দেশেই তার বৃহৎ বিজয়ী প্রতিবেশীকে অনুকরণ এর চেষ্টা করে। স্পেনের মুসলমানেরা বিজয়ী প্রতিবেশি খ্রিষ্টানদের অনুকরণ করেছে। খ্রিস্টানদের পোশাক, অলংকার এবং আচার আচরণের বিভিন্নদিক এমন কি ঘরে ছবি রাখার ব্যাপারেও মুসলমানরা তাদের অনুকরণ করেছে। সযত্ন পর্যবেক্ষণে এই হীনমন্যতা সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়বে। ইবনে খালদুন মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। তার সময়ে স্পেনিস মুসলমানদের ন্যায় আজকের ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরাও অনুকরণ করছে। অবশ্য ভুলে যাওয়া উচিত নয় বিদেশি সভ্যতার অন্ধ ও সমালোচনাহীন অনুকরণ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। আমাদের বিদেশি প্রভুরা শাসনের প্রথম লগ্ন থেকেই খুব সতর্কতার সঙ্গে আমাদের জীবন পদ্ধতি কে ধ্বংস করে সেখানে তাদের আচার পদ্ধতি চালুর ষড়যন্ত্র করেছিল। তার ফলে অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তাদের আচার-প্রথা প্রবেশ করেছে।

প্রায় ১০০ বছর আগে ব্রিটিশ সরকার উপমহাদেশে মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে রিপোর্ট প্রদান এবং কার্যকরভাবে শাসনের নির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রস্তাব দানের জন্য উইলিয়াম হান্টার কে নিযুক্ত করেছিলেন। সেই হিসেবে হাজার ১৮৭১ সালে তিনি লিখলেন: আমাদের ভারতীয় মুসলমান, তারা কেরানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বিবেকের কাছে বাধা! মুসলমানদের প্রতিরোধ ভেঙে ফেলার জন্য এবং তাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য বিদেশি প্রভূত্ব মেনে নিতে শান্তভাবে আত্মসমর্পণ করানোর জন্য সবজান্তা ডঃ প্রস্তাব করেছেন ইংরেজি শিক্ষার। তাই বইয়ের সমাপ্তি পর্বে তিনি তার সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন, এভাবে মুসলমান যুবকদের আমাদের নিজস্ব পরিকল্পনার ভিত্তিতে শিক্ষিত করে তুলতে পারি। তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে এবং ধর্ম শিক্ষার বিষয়ে সামান্যতম হস্তক্ষেপ না করে আমরা তাদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলতে পারি যাতে করে তারা ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করলেও ধর্মান্ধ হবেনা। বিশ্বের অন্যতম চরম গোড়া সম্প্রদায় হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুরা যেভাবে সহনশীলতার শিক্ষা পেয়েছে মুসলমানদেরকেও সেই পদ্ধতি অনুসরণের উৎসাহিত করা যেতে পারে। অনুরূপ সহনশীলতা মুসলমানদেরকে তাদের পূর্বপুরুষদের গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করে আনবে, যে গোঁড়ামি তাদেরকে নিষ্ঠুরতা ও অপরাধজনক কাজের মধ্যে টেনে নিয়ে গেছে। আর এসব তারা করে এসেছে ধর্ম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে।

মুসলমানি আইনশাস্ত্র আবশ্যিক বিষয় হিসেবে নিয়মিত পড়ানো হয় হবে কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু এটাকে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরে নেয়া ঠিক হবেনা। মুসলমানি আইন মানে মুসলমানি ধর্ম। মুসলমানরা সমগ্র পৃথিবীতে তাদের আইনানুগ অধিকারে বিশ্বাসী। তারা আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব, আনুগত্য অথবা খ্রিষ্টান সরকারের অধীনতার কথা জানেনা। মুসলমানি আইন সরকারের কোন প্রয়োজন এবং জীবন সম্পর্কে তার ছাত্রদের কোন ধারণা দেয় না। এর পরিবর্তে আমাদের উচিত একটা উদীয়মান মুসলিম জাতি গড়ে তোলা। যারা নিজস্ব সংকীর্ণ শিক্ষা পদ্ধতি ও মধ্যযুগীয় ভাবধারার গন্ডিতে আবদ্ধ না থেকে পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের নমনীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। ইংরেজি প্রশিক্ষণ জীবনের লাভজনক অধ্যায়ের নিশ্চয়তা দেবে। কোন পদ্ধতির প্রবর্তনের দ্বারা হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মীয় ধারণায় উন্নত করা সম্ভব। সে সম্পর্কে আমি এখানে কিছু বলতে চাই না। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে অবস্থায় তারা একদিন উপনীত হবে এবং এতদিন নেতিবাচক ভূমিকা পালন করলেও আমাদের প্রবর্তিত শিক্ষা পদ্ধতি হচ্ছে এ বিষয়ে প্রাথমিক পদক্ষেপ। উইলিয়াম হান্টার এর ভবিষ্যৎবাণী সত্যে পরিণত হয়েছে এবং আজ আমরা তার ফল ভোগ করছি। বংশ পরস্পরায় পাওয়া সেই সম্পত্তির ৪৭শের স্বাধীনতার পরও সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় এখনো বহাল রয়েছে। ব্রিটিশ শিক্ষাপদ্ধতি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়েছে। সমগ্র উপমহাদেশে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মোকাবেলা করার জন্য পর্যাপ্ত ইসলামী জ্ঞানের সক্ষম একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোথাও নেই। আমাদের যুবকেরা নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কোনো আকর্ষণ ছাড়াই বড় হচ্ছে। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই।

বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে Lord Cromer ছিলেন আরব বিশ্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব। ১৮৮৩থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ২৫ বছর প্রতিবন্ধকভাবে তিনি মিশর শাসন করেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কৌশল জানার জন্য তার বিরাট বই “Modern Egypt” অপরিহার্য। এই বইয়ের সমাপ্তিতে তিনি কোন সন্দেহের অবকাশ রাখেননি। নিজে সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের চাইতে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারনীতি ছিল তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। Lord Cromerলিখেছেন:

কোন বাস্তব জ্ঞান সম্পন্ন রাজনীতিকের চিন্তা করা ঠিক নয় যে ইসলামকে পুনর্জীবনের সক্ষম এমন পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। বস্তুত ইসলাম এখনো মরে যায়নি বরং শতাব্দি ধরে টিকে থাকার যোগ্য। তবে রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকে তা মৃতপ্রায়। তার অবনতি কোন আধুনিক তত্ত্ব প্রয়োগ এর দক্ষতা সঙ্গে করা হোক না কেন দেখানো যাবে না। এই পর্যন্ত যতটুকু বিচার করা যায়, তাতে দুটিমাত্র বিকল্প পন্থা সম্ভব, মিশরকে পর্যায়ক্রমে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে নতুবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করে নিতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই দুই বিকল্প প্রথমটির পক্ষে। আমরা যা করব তাতে ভালো,জোরদার এবং স্থিতিশীল সরকারের ব্যবস্থা করতে হবে। যা অরাজকতা এবং দেউলিয়াত্ব দূর করে মিশরকে ইউরোপের জন্য সমস্যায় পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। এ ধরনের সরকারের কাজে আমাদের বেশি মাথা ঘামানো উচিত নয়। তবে আমাদের বিদায়ের পর সরকারকে এমন ভাবে কাজ করতে হবে যা পশ্চিমা সভ্যতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এটা মনে করা ঠিক হবে না যে, মিশরের সম্পূর্ণ মুসলমানি নীতির উপর প্রাচীন চিন্তাধারা ও পশ্চাদগামী সরকার প্রতিষ্ঠার সময় ইউরোপ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে। মিশর যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে এই ধরনের চিন্তাধারা অনুসৃত হলে বস্তুগত স্বার্থের সাংঘাতিক ক্ষতি হবে। যারা এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে চান এবং সমস্যার সমাধান চান তাদেরকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে মিসরের নতুন বংশধররা পশ্চিমা সভ্যতার সত্যিকারভাবে অনুসরণ গ্রহণে বাধ্য হয়। আমার বিশ্বাস ইংল্যান্ডের সুমহান পরিচালনায় পশ্চিমা সভ্যতা কৃষ্ণ আফ্রিকার সবচাইতে দুর্বোধ্য স্থানে গিয়েও পৌঁছবে। এমনকি তাতে নতুন জীবন লাভ করবে। মিশরীয়দের অজ্ঞতা এবং অকৃতজ্ঞতা সত্ত্বেও আমি এখনো আশা করি বর্তমান এবং ভবিষ্যত বংশধরেরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে যে, অ্যাংলো স্যাক্সন জাতির লোকেরা প্রথম তাদের অত্যাচারী ক্রীতদাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে, তারা তাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে যে তারা অমানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকারী। তারা তাদের সামনে নৈতিক অগ্রগতি এবং চিন্তার স্বাধীনতা ও বস্তুগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে, পশ্চিমা সভ্যতার সত্যিকারের মহাসড়ক এটাই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মূল লক্ষ্য।

স্বাধীনতার পরও কেন আমাদের উপর বিদেশি প্রভাব এত জোরদার তার জবাব এই ব্রিটিশ শাসকের উক্তি থেকে পাওয়া যাবে। সকল প্রচারণা সত্ত্বেও আমাদের স্বাধীনতা একটা সামান্য ব্যাপার মাত্র। দীর্ঘদিন আমাদের দেশে বিদেশি শাসনাধীন ছিল, আমাদের জনগণকে অতীত ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য বিদেশি প্রভুরা খুব যত্নের সঙ্গে সবরকম প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এইভাবে তারা সাফল্যের সঙ্গে বিশেষতঃ সামাজিক দিক থেকে একদল সাক্ষীগোপাল ও গৃহ শত্রু বিভীষণ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তথাকথিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা স্বীকার করে নেয়ার পর আমাদের নেতৃত্ব এই পশ্চিমা চক্রের হাতে গিয়ে পড়ে। বিদেশি সম্রাজ্যবাদের স্বার্থে এই নেতৃত্ব অব্যাহত থাকা অসম্ভব কারণ আমাদের জনসংখ্যার বৃহৎ অংশই তাদের ধারণা এবং তাদেরকে ঘৃণা করতো ফলে গণতান্ত্রিক পন্থায় পশ্চিমা সভ্যতার বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়লো।

এই জন্য খুবই শক্ত হাতে একনায়কত্ব চাপিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হল। যারা এর বিরোধিতা করল, তাদেরকে নির্দয় ভাবেই নিশ্চিহ্ন করা হলো। এমনকি ইংল্যান্ড ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের জনগণকে দেয়া গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা মুসলমানদের দিতে রাজি হবে না কারণ তারা ভালো করেই জানেন মুসলমানদের মনে ইসলামের প্রভাব খুবই জোরদার। গণতান্ত্রিক রায় প্রকাশের সুযোগ একবার আসলেই সকল মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আর এই অবস্থা হলে এশিয়া ও আফ্রিকায় তাদের আধিপত্য চিরদিনের জন্য খতম হয়ে যাবে। এই জন্য ইসলামী আন্দোলনকে তাদের বিরাট ভয়। বিশ্বব্যাপী তাদের সংগঠিত সকল চক্রান্তের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামী আন্দোলকে শেষ করা। রাজনৈতিক দাসত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত অর্থনৈতিক দাসত্বকেও আমরা উপেক্ষা করতে পারিনা। বরং বলা যায় অর্থনৈতিক দাসত্ব আমাদের এই পরিস্থিতিতে নিক্ষিপ্ত হতে বাধ্য করেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে বৃহৎ শক্তিবর্গ বিদেশি সাহায্যের টোপ গেলাতে উৎকণ্ঠিত। উচ্চহারে সুদনিয়ে শেষ পর্যন্ত এই সাহায্য তাদেরকে দেশকে ভিক্ষুকে পরিণত করে। এতে কোনো অতিশয়োক্তি নেই যে, পশ্চিমা বিরাট বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো তাদের সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশের প্রধান মাধ্যম। অনুন্নত (এখন উন্নয়নকামী) মুসলিম দেশসমূহের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে পর্যায়ক্রমে বিরাট বিলাসবহুল ভবন, অত্যাধুনিক কারুকার্যের হোটেল, শহরের রুপ পাল্টিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয় নৈশক্লাব, এবং বারে নাচের মাধ্যমে। হলিউড থেকে অপরাধমূলক ও অবৈধ যৌন সংসর্গের জন্য ছবি আসে। তার অনুকরণে দেশে ছবি নির্মিত হয়, পর্নো ছবি, পুস্তক এবং বিদঘুটে পোশাক এসে বাজারে সয়লাভের সৃষ্টি করে। যা সামাজিক উৎকর্ষতার চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।

খাদ্যে ভেজাল দেয়া আমাদের শরীয়তে বিরাট পাপ বলে গণ্য হলেও এই পরিবেশে তার দ্রুত প্রসার লাভ করে, এবং অন্যের জীবন ও স্বাস্থ্যের বিনিময়ে ভেজালকারী দিনে দিনে প্রাচুর্যের উচ্চ শিখরে আরোহন করে। মাদকদ্রব্যের ব্যবহারও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। আমাদের বেতার গুলো কদর্য, নগ্ন গানে সাধারণ মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে। বিদেশি প্রভাবিত শিল্প ও বাণিজ্যিক সংস্থায় পুরুষদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ করিয়ে মেয়েদেরকে চাকরিতে নেয়া হয়। এইভাবে আমাদের মহিলারা স্ত্রী, মা, বোন এবং কন্যার পবিত্র আসন থেকে বাস-ট্রেনের টিকেট সংগ্রাহক, ব্যাংকের টেলিফোন অপারেটর, সেলসগার্ল, বিমানবালা, রেস্তোরাঁর ওয়েট্রেস, হোটেলের কক্ষসেবিকা, ফ্যাশন মডেল এবং বেতার, টেলিভিশন ছায়াছবি ও রাষ্ট্র আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের গায়িকা ও নর্তকীতে পরিণত হয়। এইভাবে পর্যায়ক্রমে পর্দা, বাড়ি, পরিবার, অবৈধ যৌন সংসর্গের জোয়ারে ভেসে যায়। যুবক-যুবতীরা একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে গড়ে ওঠে। এইসব ব্যাপারে আকস্মিকভাবে হয় না। বরং আমাদের উপর যারা প্রভুত্ব বজায় রাখতে চায় তারা খুব সতর্কতার সঙ্গে আমাদের জীবন প্রবাহের এইসবের অনুকরণ ও অনুপ্রবেশ করিয়ে দেয়। আমাদের শত্রুরা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে আমাদের অধঃপতন ঘটিয়ে দৈহিক ও মানসিক দিক থেকে ছোট করতে চায়। তাদের স্বার্থেই অধঃপতন ঘটুক আমাদের, দেশ দুর্নীতিতে ভেসে যাক এটাই তাদের কাম্য। এই ভীতি কার্যকরভাবে মোকাবেলার জন্য আমাদেরকে বুঝতে হবে রাজনৈতিক দাসত্ব কেন অবিচ্ছেদ্য। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বুঝতে হবে যে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া সত্যিকারের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয় এবং বিদেশি শাসনের অধীনে ইসলামের উৎকর্ষ অসম্ভব। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আমাদের ইসলামী পুনর্জাগরণ এর সকল আন্দোলনকে পূর্ণসমর্থন জানাতে হবে এবং আমাদের সরকার যাতে আইন হিসেবে ইসলামের নির্ভেজাল শরীয়তকে গ্রহণ করে সে জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

ইসলামী আন্দোলনকে সকল গণসংযোগ মাধ্যমের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। কোন বিদেশি শক্তি যাতে আমাদের ভুখন্ডে সামরিক ঘাঁটি করতে না পারে তার তীব্র বিরোধিতা করতে হবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আমাদের সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব সম্পদ ও বন্ধু মুসলিম দেশগুলোর উপর নির্ভর করতে হবে। বিদেশি সাহায্যে অবশ্যই পরিহার করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেন বিশেষ করে বৃহৎ শক্তিবর্গের সঙ্গে আমাদের সমঅংশীদারি হিসেবে সৎ ব্যবসার উপর জোর দিতে হবে। ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ সবসময় ইসলামকে তাদের শক্তিশালী শত্রু জ্ঞান করে আসছে ফলে তাদের নতুন বংশধরেরা একই দৃষ্টিভঙ্গিতে ইসলামকে অধ্যয়ন করে থাকে। পশ্চিম ইউরোপ থেকে উদ্ভূত দর্শনই প্রতিটি মুসলিম দেশে ইসলামী জীবন পদ্ধতি পুনরুজ্জীবনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে আছে। এই কারণে আমাদের কিছু উলামাকে ইউরোপের সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন পড়তে হবে। যাতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে উন্নত দর্শন উপস্থাপন করা যায়। একইভাবে সকল দিক থেকে আমাদের সাম্রাজ্যবাদের মোকাবেলা করতে হবে যাতে ঈমানের বৃদ্ধি শক্তি করে আমরা দুনিয়া-আখেরাতের সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারি।

প্রবন্ধটি মরিয়ম জামিলা ’ইসলাম ও আধুনিকতা গ্রন্থ থেকে নেয়া’
সূত্রঃ জাতীয় সাংস্কৃতি পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত ”সংস্কৃতিঃ জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন ২০০২” স্মারক গ্রন্থ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here